ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে গত বছর স্বর্ণের চাহিদা ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ওই সময় মূল্যবান ধাতুটির দাম প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছরও স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে। ফলে দাম আরো বাড়বে। সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
জরিপে অংশ নেয়া ব্যাংক ও স্বর্ণ পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্বর্ণের দাম ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্সে প্রায় ২ হাজার ৭৯৫ ডলারে পৌঁছতে পারে, যা ধাতুটির বর্তমান দামের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি।
ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ অবস্থায় অন্যান্য দেশ সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞাজনিত ঝুঁকি এড়াতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বর্ণের রিজার্ভ গড়ায় ঝুঁকছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রয় বাড়িয়ে দিলে স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী হবে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার কর্তন, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনে সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে স্বর্ণের দাম বাড়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এসব কারণেই গত বছর ২০১০ সালের পর ধাতুটির দাম বার্ষিকভিত্তিতে সবচেয়ে বেড়েছে।
হেরাউস প্রেশাস মেটালসের গ্লোবাল ট্রেডিং বিভাগের প্রধান হেনরিক মার্কস বলেন, ‘আমরা মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রহের কারণে এ বছর স্বর্ণের বেচাকেনা বাড়বে।’ তিনি পূর্বাভাস দেন, ধাতুটির দাম চলতি বছর প্রতি ট্রয় আউন্সে ২ হাজার ৯৫০ ডলার ছুঁতে পারে।
তিনি আরো বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদও স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি (ট্রাম্প) যা-ই ঘোষণা করেন না কেন, তা জাতীয় ঋণ বাড়াবে। ফলে ডলার দুর্বল হওয়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এটি সাধারণত স্বর্ণের জন্য একটি ইতিবাচক পরিস্থিতি।’
জরিপে অংশ নেয়া বিশ্লেষকদের মধ্যে সবচেয়ে আশাবাদী পূর্বাভাস দিয়েছে গোল্ডম্যান স্যাকস। তারা আশা করছে, স্বর্ণের দাম ২০২৫ শেষে ৩ হাজার ডলারে পৌঁছবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও সুদহার কর্তনকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ফেড সুদহার কমালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আরো স্বর্ণ ক্রয় করতে চাইবে।
তবে বার্কলেস ও ম্যাককোয়ারি বলছে, এ বছরের শেষে স্বর্ণের দাম প্রতি ট্রয় আউন্সে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডলারে নেমে যেতে পারে, যা বর্তমান দামের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ কম। ম্যাককোয়ারির বিশ্লেষকরা বলেন, ‘২০২৫ সালে স্বর্ণের ওপর মার্কিন ডলারের চাপ অব্যাহত থাকবে। তবে স্বর্ণালংকার ও রিজার্ভের জন্য ক্রয় বাড়লে দাম বাড়তে পারে।’
২০২৪ সালের প্রথম নয় মাসে বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ৬৯৪ টন স্বর্ণ কিনেছে। পিপলস ব্যাংক অব চায়না গত বছরের নভেম্বরে ঘোষণা দেয়, তারা ছয় মাসের বিরতির পর আবারো স্বর্ণ কেনা শুরু করেছে।
ফেডের সুদহার কর্তন গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে স্বর্ণের দাম বাড়াতে সহায়তা করেছে। একইভাবে এ বছরও সুদহার বাজারের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তবে ২০২৫ সালে সুদহার আগের তুলনায় ধীরগতিতে কমতে পারে বলে জানিয়েছে ফেড।
স্বর্ণ হলো একটি অ-উৎপাদনশীল সম্পদ। ফলে এটি সাধারণত নিম্ন সুদহারের সময় বেশি মুনাফা দেয়। তাছাড়া বিনিয়োগের সুযোগ ব্যয় কম।
বিগত মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পর স্বর্ণের বাজারে সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সোসিয়েট জেনারেলের পণ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান মাইকেল হেইগ বলেন, ‘ট্রাম্পের বিজয়ে মার্কিন সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। ফলে স্বর্ণের দাম আবারো বাড়েছ।’ ২০২৫ শেষে দাম প্রতি ট্রয় আউন্সে ২ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।